Header Ads

Header ADS

অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন খাত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ





অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন খাত

সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। দেশটিতে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলেও সবকিছু মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির দিকে। ক্রমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাড়ছে মাথাপিছু আয়। বাড়ছে উৎপাদন। ধীরে ধীরে কিছু কিছু সেক্টরে কমছে আমদানিনির্ভরতা। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে করছে বিদেশে রফতানি। বাংলাদেশের শিল্পখাতগুলো দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠিত শিল্পখাত ছাড়াও বর্তমানে কিছু উদীয়মান শিল্পখাত আছে যেগুলোর রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এই শিল্পখাতগুলোকে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করা গেলে দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। অনেক উদীয়মান শিল্পখাতের মধ্যে ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন খাত উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের চাহিদা ব্যাপক। টিভি, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল, ফ্যান, জেনারেটর, ওভেনসহ আরো নানা রকম ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। এক সময় শুধু উচ্চবিত্তরা এই ইলেকট্রনিক্স পণ্য ব্যবহার করলেও এখন প্রায় সব শ্রেণীর লোকের কাছে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ইলেকট্রনিক্স পণ্যের চাহিদা পূরণ করার জন্য বিদেশ থেকে আমদানি বাবদ আমাদের বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। একটা সময় আমাদের দেশে এই পণ্যগুলো উৎপাদন করা না হলেও বর্তমানে অনেক কোম্পানি উন্নতমানের ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে। 
এখন আর আমাদের এই সব সামগ্রীর জন্য অন্য দেশের মুখাপেক্ষী না হলেও চলবে। রেফ্রিজারেটর, মোটরসাইকেল এয়ারকন্ডিশনার এবং টিভি উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের তৈরি এসব পণ্য রফতানিও হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ফ্রিজের চাহিদা বছরে ১০ লাখ, উৎপাদন হচ্ছে ১৪ লাখ। তিন লাখ মোটরসাইকেলের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন সম্ভব। এসির চাহিদা ১ লাখ হলেও উৎপাদন ক্ষমতা এর প্রায় তিনগুণ। বলা চলে উচ্চ প্রযুক্তির এসব পণ্য তৈরিতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে এ সেক্টরে অন্যতম শীর্ষস্থান দখলের। বাংলাদেশের তৈরি ইলেকট্রনিক্স পণ্য পৃথিবীর যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই ক্রেতাদের মন জয় করে নিচ্ছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার দিকে থেকে বিশ্বের শীর্ষ ২০ এ জায়গা করে নিচ্ছে বাংলাদেশ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শীর্ষ ব্র্যান্ডের সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশ নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। এই সেক্টরে বাংলাদেশে একটা জোয়ার বয়ে যাচ্ছে এবং পূর্ণমাত্রায় সরকারী সাপোর্ট থাকলে ভারত এবং চীনের চেয়েও আমাদের সম্ভাবনা বেশি। তারজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এই শিল্পকে যদি উপযুক্ত প্রেষণা, পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া যায় তবে আমরা আমাদের পণ্য বিদেশেও বেশি পরিমাণ রফতানি করতে সক্ষম হবো। এই সেক্টরে বাংলাদেশের অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এই খাতে যারা বিনিয়োগ করছেন তাদের বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে উদ্বিগ্ন হতে হচ্ছে। বিশেষ করে রেফ্রিজারেটর, মোটরসাইকেল, এয়ারকন্ডিশনার এবং টিভি সেট উৎপাদনকারীদের বিপক্ষে নানা প্রপাগা-া চালাচ্ছে আমদানিকারকরা। যার ফলে এ খাতের বিশাল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার এই খাতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার জন্য ভ্যাট সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এই সব পণ্য আমদানিকারকরা এর বিরোধিতা করছে। তারা উৎপাদনকারীদের যে ভ্যাট সুবিধা দেয়া হচ্ছে তা বাতিলের জন্য দাবি তুলছে অনেকদিন থেকেই। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত এই সুবিধা দেয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য। এই সুবিধার আলোকে ওয়ালটন, রানার, ইউনিটেক, মাইওয়ান, বাটারফ্লাইসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বিশাল বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন। তারা এই সব পণ্য উৎপাদন করায় আমাদের এখন আর আমদানি বাবদ প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না। নিজেরাই মোটামুটিভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে যাচ্ছি। কিন্তু এখন এই ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ঋণ এবং বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়ে বেকায়দায় পড়ে যাবেন। যারা বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছিলেন তারাও এ পথ মাড়াবেন না। আর তাহলে সম্ভাবনাময় এই খাতটিরও উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। এজন্যই সরকারের উচিত এই খাতটির প্রসারণও উপযুক্ত শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পলিসি তৈরি করা। এমনিতেই ব্যাপক আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের কারণে দেশীয় উৎপাদনকারীরা ক্ষতির সম্মুখীন। অনেক অসাধু আমদানিকারকের আমদানিপত্রে দেখা যায় যে, পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন ডলারে একেকটি এসি আমদানি করা হচ্ছে। যেখানে এসির একটি কম্প্রেসারের দামই আশি থেকে এক শ’ ডলার। এখন পচিশ’ ডলারের একটি এসিতে দুইশ’ পারসেন্ট শুল্ক দিলেও তার পরিমাণ পঞ্চাশ ডলার। এভাবে তারা সরকারকে রাজস্ব লাভ থেকে বঞ্চিত করছে। আর দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিটিতে বিশ হাজার টাকার কাঁচামাল ব্যবহার করে শুল্ক দিতে হচ্ছে এক শ’ পঁচিশ ডলার। ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি শুল্কও দিতে হচ্ছে। একদিকে কিছু অসাধু আমদানিকারক রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে অন্যদিকে দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হচ্ছে। এর পেছনে কিছু আন্তর্জাতিক চক্রও কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। ঐসব চক্র চায়না এদেশে শিল্প গড়ে উঠুক, বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারা চায় বাংলাদেশকে বিদেশী পণ্যের ডাম্পিং স্টেশন বানাতে। এর পেছনে বহুজাতিক কোম্পানি এবং তাদের এদেশীয় দোসররা কাজ করছে। বাংলাদেশ এই খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হতে পারলে আদৌতে তাদেরই লাভ। তারা বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে। তাই এই চক্রগুলো অত্যন্ত সক্রিয়। গার্মেন্টস শিল্পের মতোই এ খাতটিও তাই ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে। বিদেশে পণ্য রফতানি করতে গিয়ে আমাদের দেশের উৎপাদনকারীদের নানা ধরনের টেস্টের মুখোমুখি হয়। টেস্টে উতরিয়ে গেলেই তবে তারা আমাদের পণ্য আমদানির অর্ডার দেয়। নানা রকম টেস্টের মোকাবেলা করে উন্নত পণ্যে হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আমাদের দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্যে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। এবং সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। মেইড ইন বাংলাদেশ খ্যাত পণ্যগুলো বিদেশী নাগরিকদের মন জয় করে নিতে সক্ষম হচ্ছে। অথচ বিদেশী নিম্নমানের পণ্য অবাধে ঢুকছে আমাদের দেশে। এই ক্ষেত্রে আমাদের দেশে তেমন টেস্টের সুবিধা নেই। তাই বিদেশীরা ডাম্পিংয়ের মাধ্যেমে আমাদের বাজারে কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা করছে। আর আমাদের দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ঐ বিদেশী কোম্পানিগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে দেশের টাকা বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তারা দেশীয় শিল্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন, আর এর অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে বিদেশী কোম্পানিগুলো। এদের ছত্রছায়ায় কতিপয় মহল সরকারকে বিলাসজাত সামগ্রীর আমদানি শুল্ক কমানোর ওপর চাপ দিচ্ছে। কিন্তু আমদানি শুল্ক কমালে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে। রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। নিম্নমানের বিদেশী পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়বেন; এমনকি ফ্যাক্টরি বন্ধ করেও দিতে হতে পারে। তখন কেউ বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবেন না। প্রযুক্তিখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হবে। সেক্ষেত্রে দেশে তৈরি পণ্যের দাম বাড়বে এবং তার চাপ পড়বে ক্রেতাদের ওপর। আবার উৎপাদন খরচ বাড়লে প্রতিযোগিতামূলক বৈদেশিক বাজারে রফতানিও সম্ভব হবে না। এই সব বিষয়ে সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকার দেশের শিল্পখাতের বিকাশের জন্য আন্তরিক। শুধু আন্তরিক হলেই হবে না, সরকারকে এই জন্য নানারকম উপযুক্ত প্রণোদনা যেমন দিতে হবে, তেমনি কোন আন্তর্জাতিক চক্র যাতে এই শিল্পবিকাশে ষড়যন্ত্র করে সফল হতে না পারে তার চেষ্টাও করতে হবে। ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন খাতের প্রসারের জন্য সরকার যে সকল সুবিধা দিচ্ছে তা অব্যাহত রেখে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। আর এর ফলে বিনিয়োগে আগ্রহীরা এই খাতে বিনিয়োগের দিকে বেশি করে ঝুকবে। আর এই সম্ভাবনা খাতেরও প্রসারণ ঘটবে। এতে কমে যাবে আমদানি নির্ভরশীলতা। বাড়বে রফতানি। বৃদ্ধি পাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে দেশ।

No comments

Theme images by enot-poloskun. Powered by Blogger.